• ঢাকা
  • | |
Alifhostbd

জনবুদ্ধিজীবী এমাজউদ্দীন আহমদ


FavIcon
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 17, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: Alifhostbd

আজ ১৭ জুলাই ২০২৬। সময়-নদীর প্রবল স্রোতে আমাদের মাঝ থেকে অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদের বিদায় নেয়ার ছয়টি বছর পূর্ণ হলো। এই ছয় বছরে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে এত গভীর ওলটপালট এবং গুণগত রূপান্তর ঘটে গেছে যে, ইতিহাসের এই নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে অবধারিতভাবেই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে আমাদের এই প্রিয় শিক্ষক ও অভিভাবককে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে দেশ যে নতুন এক ‘জন-আকাক্সক্ষা’ বুকে ধারণ করে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে ড. এমাজউদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়; বরং পথ হারানোর মুহূর্তে এক আলোকবর্তিকা। বেদনার বিষয়, তার আরাধ্য যে গণতন্ত্রের দুয়ার আজ খুলে গেছে, সেই বিজয় দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিন ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাতভর তাণ্ডবের সময় কয়েকজন ছাত্রসহ আমি কলাভবনের চারতলার একটি কক্ষে আটকে ছিলাম সারারাত। কক্ষটি চা বানানোর জন্য ব্যবহার করা হতো। একজন কর্মচারী আমাদের তালা মেরে চলে গিয়েছিল। তাই আমরা পিটুনি এবং গ্রেপ্তার হওয়া থেকে বেঁচে যাই। তাকে অনুরোধ করা হয়েছিল সকাল হলে এমাজউদ্দীন স্যারকে খবর দিতে। সে তাই করেছিল। সকাল আটটার দিকে লুঙ্গী, সার্ট আর চটি পড়ে স্যার এসে আমাদের উদ্ধার করেন। কলাভবনের সামনে মারমুখী পুলিশ তেড়ে এলে স্যার আমাদের আগলে রাখেন। পুলিশকে বলেন- ‘এরা আমার ছাত্র। এরা আমার সন্তান।‘ তারপর আমাদের বাসায় নিয়ে যেয়ে চা-নাস্তা খাইয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। তাঁর কাছে সবাই ছিল আগে ছাত্র, পরে তাদের রাজনীতি। 
বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ড. এমাজউদ্দীন আহমদের প্রচণ্ড আত্মসম্মানবোধ ছিল।  তার পরিচয় দিয়েছেন ১৯৯৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর একজন প্রভোস্ট নিয়োগকে কেন্দ্র করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মরহুম এ এস এইচ কে সাদেকের সঙ্গে মতবিরোধের জের ধরে পদত্যাগ করে । একজন নরম, কোমল ও মৃদুভাষী ব্যক্তিও সুদৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন এমাজুদ্দিন সেটি প্রমাণ করেছিলেন। বর্তমানে এই দৃঢ়তার খুব অভাব। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সাথে আমার ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে খুব পছন্দ করতেন।
প্রফেসর ড.এমাজউদ্দিন আহমদ ১৯৩৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন মালদহ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ) জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ‘গোহাল বাড়ি’ এলাকায় পরিবারসহ দীর্ঘদিন বসবাস করেন প্রফেসর এমাজউদ্দিন। তিনি শিবগঞ্জের আদিনা সরকারি ফজলুল হক কলেজ ও রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, পাশাপাশি পালন করেছেন প্রশাসনিক দায়িত্বও-- ছিলেন বিভাগীয় প্রধান, মহসিন হলের প্রভোস্ট, প্রক্টর, প্রো-ভিসি এবং সবশেষে ভিসি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এমাজউদ্দীন আহমদ।
মহান ভাষা আন্দোলনের কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ কারাবরণও করেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তুলনামূলক রাজনীতি, প্রশাসন-ব্যবস্থা, বাংলাদেশের রাজনীতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। দেশ বিদেশের খ্যাতনামা জার্নালে তার প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। তার লিখিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা(১৯৬৬), মধ্যযুগের রাষ্ট্র চিন্তা (১৯৪৫), তুলানামূলক রাজনীতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (১৯৮২), বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংকট (১৯৯২), সমাজ ও রাজনীতি (১৯৯৩), গণতন্ত্রের ভবিষৎ ( ১৯৯৪), শান্তি চুক্তি ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৯৮), আঞ্চলিক সহযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্তা (১৯৯৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০০) এছাড়াও ইংরেজিতে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত তার অনেক বই বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের পাঠ্যসূচীতেও অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯২ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে।  
বিএনপির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং দলটির নীতি-নির্ধারণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। সরাসরি বিএনপির কোনো পদে না থাকলেও দলটি তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিত। বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত শত নাগরিক কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর অস্বস্তি ছিল সব সময়। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলেছেন। এই সম্পর্ক যে বিএনপির জন্য ক্ষতিকর, এটা বলতেও দ্বিধা করেননি। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও টেকসই গণতন্ত্রের জন্য তিনি আমৃত্যু ইতিবাচক কথা বলে গেছেন। কোনও বিষয়ে সমালোচনায় তাঁর বক্তব্যে থাকত যুক্তি ও গঠনমূলক পরামর্শ। খুব শান্ত এবং নরম ভাষায় কথা বলতেন তিনি। বিক্ষুব্ধ হোক কিংবা শান্ত হোক, ছাত্রদের বলতেন- ‘আচ্ছা বাপু’ অথবা ‘বলো বাপু’ । তাঁকে কখনও রেগে যেতে দেখিনি। প্রভোস্ট, প্রক্টর, প্রো-ভিসি এবং ভিসি থাকাকালে  পালিয়ে যাননি আন্দোলন আর বিক্ষোভের সময়ে। অবরুদ্ধ হয়েও পুলিস ডাকেননি। 
তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। ভাল থাকবেন স্যার। আপনার চিরশান্তি কামনা করছি।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ