হাসিনার সঙ্গে শিক্ষকদের গোপন যোগাযোগ, ৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 6, 2026 ইং
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একাংশের যোগাযোগ ও বৈঠক এবং তাকে দেশে ফেরাতে তৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্প্রতি বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে ‘গোপন যোগাযোগে লিপ্ত’ রয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। এই চার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাবির ৪২ শিক্ষকের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি
বুধবার (৫ আগস্ট) দিবাগত রাতে রাবি জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাবি শিক্ষকদের বিষয়ে তথ্যানুসন্ধানের জন্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২ (প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ)-কে সভাপতি করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ৪০৪ শিক্ষকের মধ্যে ৪২ জন রাবির শিক্ষক।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিস্ট সংগঠন আওয়ামী লীগের সাথে গোপন যোগাযোগে লিপ্ত থাকার বিষয়টি রাবি কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের প্রচলিত আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের শামিল। এসকল অপতৎপরতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশে বিভ্রান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্র ও আইনবিরোধী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হীন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এহেন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও নৈতিক অবস্থানের প্রতি চরম অবজ্ঞাসুলভ। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।
পবিপ্রবিতেও তদন্ত কমিটি
রাবির মতো একইভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করে তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য জানিয়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। বুধবার (৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে এ-সংক্রান্ত এক অফিস আদেশে বলা হয়, গত ৪ ও ৫ আগস্ট বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শীর্ষক একটি সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যাদের মধ্যে পবিপ্রবির কতিপয় শিক্ষকও রয়েছেন।
এরই প্রেক্ষাপটে জড়িত শিক্ষকদের পরিচয়, কার্যক্রম ও দায় নিরূপণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. সাইফুল ইসলামকে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পবিপ্রবি আইন, ২০০১-এর ৪৭(৪) ধারা, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(ঙ) ধারা এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১২৪ক ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, যার মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্তও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অনলাইনে মিটিংয়ে উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে পবিপ্রবি কয়েকজন শিক্ষকের নাম উঠে আসলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সন্তোষ কুমার বসুকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইবির ৪৪ শিক্ষকের রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ডের তদন্তে কমিটি
একই ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ৪৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন। বুধবার (৫ আগস্ট) ইবি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিতে বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। কমিটিকে আগামী ১২ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন শিক্ষক রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কার্যকলাপে জড়িত থাকার প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্তপূর্বক রিপোর্ট প্রদানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে আহ্বায়ক এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-হিসাব পরিচালক মো. ইসরাফুল হককে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
নোবিপ্রবিতে ৩ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কোনো শিক্ষক এ ঘটনায় জড়িত আছেন কি না, তা অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. তামজিদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক গোপন তৎপরতায় জড়িত রয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে নোবিপ্রবির কোনো শিক্ষক এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত আছেন কি না, সে বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে এই ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা যায়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর গোপন তৎপরতায় নোবিপ্রবির ৩৮ জন শিক্ষকের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামকে।
আপনার মতামত লিখুন :