জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ : হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 30, 2026 ইং
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন।
বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে মামলার একমাত্র আসামি ইনুকে হাজতখানা থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এর ১০ মিনিট পর ২১১ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু হয়। ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারক শাহরিয়ার কবীর এবং সাক্ষীদের বিবরণ ও তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ। রায়ের এই পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
ইনুর বিরুদ্ধে আনা আট অভিযোগ হলো :
প্রথম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক অ্যাখ্যা দেন ইনু। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা দেন এবং হত্যারও নির্দেশ দেন তিনি।
দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪–দলীয় জোটের সভা হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর সিদ্ধান্ত হয়। হাসানুল হক সেই সভায় উপস্থিত থেকে ‘শুট অ্যাট সাইটের’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।
তৃতীয় অভিযোগ, ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতার তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ।
চতুর্থ অভিযোগ, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার করা এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা করার অভিযোগ।
পঞ্চম অভিযোগ, গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। সরকারের গ্রহণ করা হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন–নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করা।
ষষ্ঠ অভিযোগ, ১৪–দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
সপ্তম অভিযোগ, শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকা।
অষ্টম অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যায় নির্দেশনা প্রদান। পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র–জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কাজ শুরু করে। ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ও ইনুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়। গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন এবং আসামিপক্ষে দুজন সাক্ষ্য দেন। এছাড়া ২০ সিরিজের ডকুমেন্ট ও পাঁচটি বস্তু প্রদর্শনী আদালতে উপস্থাপন করা হয়। গত ১ ডিসেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলে। যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন এবং সর্বশেষ ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল এই কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
আপনার মতামত লিখুন :