• ঢাকা
  • | |
Alifhostbd

মৃত্যুর পর যে শহরে মেলে না সাড়ে ৩ হাত মাটি


FavIcon
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 6, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: Alifhostbd

|| আহমেদ সিরাজ ||
জন্ম হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। অনেকের জীবনে মৃত্যুর পর এই শহরে মেলে না সাড়ে ৩ হাত মাটি। দর দামে না মিললে ফেরত যেতে হয় গ্রামের বাড়িতে। এমনি শহর রাজধানী ঢাকা।  যেখানে প্রিয়জনের দাফন কখনোই সহজ ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কবরস্থান ব্যবস্থাপনা, কবর সংরক্ষণ এবং খনন-দাফনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সংরক্ষিত কবরের ক্ষেত্রে উচ্চ ফি সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।

যে শহরের মাটিতে মিশে থাকে মানুষের জীবনের দীর্ঘ সময়ের ঘাম, শ্রম আর সংগ্রামের গল্প, জীবনাবসানের পর সেই শহরই যেন হয়ে ওঠে অপরিচিত। কবরের জন্য সামান্য জায়গাও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

নগরবাসীর অনেকে মনে করেন, গ্রামে পারিবারিক জমি ও পূর্বপুরুষদের কবর থাকায় সেখানে দাফনের সুযোগ তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ঢাকায় অধিকাংশ মানুষের নিজের কোনো জমি না থাকায় মৃত্যুর পর স্থায়ী কবরের নিশ্চয়তা পাওয়া কঠিন। এছাড়া, কবর সংরক্ষণের খরচও অনেকের জন্য বড় বাধা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অন্য এলাকাগুলোতেও ব্যয় কোটি টাকার ঘরেই। অন্য এলাকাতেও সেই খরচ ১ থেকে দেড় কোটি টাকার কম নয়। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এমনকি জায়গার অভাবে সিটি করপোরেশনও অনুৎসাহিত করছে কবর সংরক্ষণে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক পরিবার দীর্ঘদিন কবর সংরক্ষণ করতে চাওয়ায় কবরস্থানে নতুন দাফনের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এই জায়গা সংকট সামাল দিতেই কবর সংরক্ষণ ফি বাড়ানো হয়েছে। তবে বাস্তবে এই ফি বৃদ্ধির মাত্রা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

ডিএসসিসি বলছে, নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষিত কবরের স্থায়ী সংরক্ষণ করতে হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কবর সংরক্ষণে আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে প্রাথমিক আবেদন জমা দিতে হবে। এরপর বিষয়টি কবর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং সিটি করপোরেশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সংরক্ষণ ফি জমা দিয়ে কবর সংরক্ষণ করা যাবে।

সংরক্ষিত কবরের সর্বোচ্চ মেয়াদ এককালীনভাবে ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। সংরক্ষণ মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের জন্য নতুন করে আবেদন করতে হবে এবং নির্ধারিত নবায়ন ফি পরিশোধসাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানো যাবে। কবরের পরিমাপ সংরক্ষিত কবরের জন্য সর্বোচ্চ ৮ ফুট, সর্বনিম্ন ৪ ফুট এবং উচ্চতা ৩ ফুট পর্যন্ত নির্ধারিত। সংরক্ষিত কবরের উপর পুনঃকবর দেওয়ার ক্ষেত্রে বনানী কবরস্থানে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য কবরস্থানে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পুনঃকবর শুধু মৃত ব্যক্তির স্বজনদের জন্য অনুমোদিত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, উত্তর সিটির আওতায় বর্তমানে ছয়টি কবরস্থান পরিচালিত হচ্ছে। সেগুলো হলো বনানী কবরস্থান, উত্তরা ৪নং সেক্টর কবরস্থান, উত্তরা ১২নং সেক্টর কবরস্থান, উত্তরা ১৪নং সেক্টর কবরস্থান, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এবং রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থান।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিটি মৃতদেহ দাফনের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। দরিদ্র বা অসহায় পরিবারের জন্য ফি ১০০ টাকা নেওয়া হয়। দাফনের সময় সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নির্ধারিত আছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনভুক্ত বনানী কবরস্থান চালু হয় ১৯৭৩ সালে। ১০ একর আয়তনের এই কবরস্থানে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার কবর রয়েছে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এখানে কাউকে কবর দিতে গেলে খরচ হতো প্রায় ১৫ লাখ টাকা। পরে ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত কবরস্থানের জায়গা সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। ২০০৮ সাল থেকে পুনরায় বিভিন্ন মেয়াদে কবর সংরক্ষণ শুরু করেডিএনসিসি। বর্তমানে এই কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কবরস্থান পরিচালনা নীতিমালা-২০২০ এ বলা আছে, নির্ধারিত সিটি করপোরেশনের কবরস্থানে দুই ধরণের কবর রয়েছে। প্রথম ধাঁচের কবর হচ্ছে সাধারণ ক্যাটাগরির। সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি এবং বাঁশ-চাটাইয়ের দাম দিয়েই দাফন সম্পন্ন করা যাবে। সাধারণ ক্যাটাগরির কবর ১৮ মাস পর্যন্ত অক্ষত থাকবে। পরে কবর চালা (পুনঃখনন) করে সেখানে আবার নতুন কবর তৈরি করা হবে।

কেউ কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে তাদের গুণতে হবে বাড়তি অর্থ। মূলত চার মেয়াদে দক্ষিণের কবর সংরক্ষণ করা যাবে। ১০ বছর মেয়াদী কবর সংরক্ষণের জন্য খরচ হবে ৫ লাখ টাকা। এছাড়া ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা ফি সিটি করপোরেশনে জমা দিয়ে কবর সংরক্ষণ করা যাবে।

চাইলে সংরক্ষণ করা কবরে নিকটাত্মীয় যেমন- মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই কিংবা বোনকে দাফন করা যাবে। এক্ষেত্রে পুনঃকবর ফি হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে।

বনানী, উত্তরা- ৪, ১২, ১৪ নম্বর সেক্টর, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন মোট ছয়টি কবরস্থান উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। এসব কবরস্থানের তিন ভাগের এক ভাগ জমি সংরক্ষিত এবং বাকি দুই ভাগ সাধারণ কবরের জন্য বরাদ্দকৃত।

ঢাকা উত্তরের দাফন ফি দক্ষিণের থেকে কম হলেও, কবর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণের তুলনায় উত্তর কয়েকগুণ বেশি ব্যয়বহুল। উত্তরে মূলত ১৫ বছর এবং ২৫ বছর এই দুই মেয়াদে কবর সংরক্ষণ করা যায়। সংরক্ষণ ফি নির্ভর করে কবরস্থানের ওপরে।

বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ফি বাবদ দিতে হবে ১ কোটি টাকা। আর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইলে গুণতে হবে দেড় কোটি টাকা।

উত্তরা ৪নং সেক্টরের কবরস্থানের ১৫ বছর ও ২৫ বছরের মেয়াদের সংরক্ষণ ফি যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২নং সেক্টরে এ ফি ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ এবং উত্তরা ১৪নং সেক্টরে সংরক্ষণ ফি যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ ফি ২০ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে সংরক্ষণ ফি যথাক্রমে ১০ লাখ এবং ১৫ লাখ টাকা।

সরকারি ফি সহ ঢাকার অন্যান্য কবরস্থানগুলোতে মৃতদের দাফন করতে ৬-১০ হাজার টাকা খরচ হয়। সাধারণভাবে এসব কবর ১৫-২০ মাস পর্যন্ত থাকে। তবে কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের বিশেষ বকশিস দিলে তা আরও বেশি দিন অক্ষত থাকে বলে অভিযোগ নগরবাসীর।

প্রতিটি কবরস্থানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া কবরের সমাহিতকরণের জন্য বাঁশ ও চাঁটাই সরবরাহের দায়িত্বে ইজারাদার থাকেন। দাফনের সরকারি ফি প্রতিটি কবরস্থানে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দৈনন্দিন কার্যক্রম সকাল ছয়টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পরিচালিত হয়।

ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, খিলগাঁও কবরস্থান সম্প্রসারণের জন্য সরকারি জমি চাওয়া হয়েছে। জমি পাওয়া গেলে নতুন করে স্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু কেউ কেউ আর ফিরতে পারেন না। মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে দাফন করতেই স্বজনদের পড়তে হয় নতুন এক সংগ্রামে।

দাফনের জন্য কবরস্থান অফিসে যোগাযোগ, নিবন্ধন, ফি পরিশোধসহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। শোকের মধ্যেই শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। অথচ ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি কবরস্থানের সংখ্যা বা পরিধি। ফলে দীর্ঘদিন রাজধানীতে বসবাস করলেও মৃত্যুর পর শেষ আশ্রয় সেই গ্রামেই। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিকল্পিত নগরে জনসংখ্যার অনুপাতে কবরস্থানের জায়গা রাখার কথা থাকলেও, সেই প্রস্তুতি নেই ঢাকার। ফলে সংকুচিত হচ্ছে মৃত্যুর পরের আশ্রয়ও।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মূল্যবান জমি যদি টাকা দিয়ে কিনতে হয় সরকার টাকা দিয়ে কিনবে। কিন্তু মানুষকে তার অধিকার দিতে হবে। সেজন্য মৃত্যুর পরেও তার প্রিয়জনের কাছে অন্তত কাছাকাছি কবরস্থানেই দিয়ে যেতে পারে, সেখানে তার জন্য একটু দোয়া করতে পারে। এবং এটা মানুষকে কিন্তু বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। 

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাজধানীর কবরস্থানগুলো বহু মানুষের আবেগ ও স্মৃতির কেন্দ্র হয়ে আছে। আজিমপুর কবরস্থানে মায়ের কবর জিয়ারত করতে আসা একজন কবির হোসেন বলেন, কবরের পাশে দাঁড়ালে এখনও মনে হয় তিনি মায়ের সঙ্গেই কথা বলছেন। তার কাছে মায়ের উপস্থিতি আজও অনুভব করেন তিনি।

এই কবরস্থান কর্তৃপক্ষ বলেন, নতুন করে কবর সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কারণ সবাই যদি স্থায়ীভাবে কবর সংরক্ষণ করতে চান, তাহলে সাধারণ মানুষের দাফনের জন্য জায়গা সংকট আরও তীব্র হবে। সাধারণত একটি কবর দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভেঙ্গে ফেলা হয় বা নতুন কবর দেওয়া হয়। তবে পূর্বে দাফন করা ব্যক্তির কবর শনাক্ত করতে সারিভিত্তিক নম্বর সংরক্ষণ করা থাকে।  সেই নম্বর দিয়েই শনাক্ত করা যাবে অতীতে দেওয়া কবর।  

রাজধানীতে অনেক মানুষ সারাজীবন ভাড়া বাসায় কাটান। মৃত্যুর পরও তাদের নিজের নামে কোনো স্থায়ী জায়গা থাকে না। ফলে ঢাকায় এখন মৃত্যু শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা নয়, বরং শেষ আশ্রয়ের জন্যও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার নাম।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ