ঢাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে অপরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস
Naresh
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 29, 2026 ইং
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস, বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে স্কুল-কলেজের ছাদ, মাঠ, ড্রেন, পরিত্যক্ত স্থান ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা অল্প পানি এই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা ও বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, পানি নিষ্কাশন এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারিতে ঘাটতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।
গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও বৃষ্টির পানি জমে আছে, কোথাও আবর্জনায় আটকে আছে ড্রেনের মুখ। আবার কোথাও পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা বালতি, ফুলের টব কিংবা নির্মাণসামগ্রীর ফাঁকে পানি জমে আছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল ভবন ও প্রবেশপথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও ক্যাম্পাসের পেছনের অংশ, সিঁড়ির নিচে, পুরোনো ভবনের আশপাশ, ক্যান্টিনের পেছনে, কর্মচারীদের ব্যবহৃত স্থান কিংবা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত জায়গায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখা গেছে।
বিশেষ করে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবন, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পুরোনো ড্রেনেজ অবকাঠামোর কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেতে পারছে না। কোথাও ড্রেনের ঢাকনা নেই, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় নালার মুখ বন্ধ হয়ে আছে। আবার কোনো কোনো স্থানে ড্রেন থাকলেও পানি প্রবাহের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকছে। এসব স্থান এডিস মশার প্রজননের সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রাবাস, স্টোররুম, পুরোনো ভবনের পেছনের অংশ, ক্যান্টিন, খেলার মাঠের প্রান্ত, নির্মাণাধীন এলাকা এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী রাখার স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এসব জায়গা দীর্ঘ সময় নজরদারির বাইরে থাকলে সামান্য বৃষ্টিতেও পানি জমে থাকতে পারে। সেই পানি পরে এডিস মশার প্রজননের সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে।
রাজধানীর ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাস ও আশপাশের আবাসিক এলাকাতেও এমন চিত্র দেখা গেছে। ক্যাম্পাসের সামনের অংশ তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন থাকলেও পেছনের আবাসিক এলাকা ও কম ব্যবহৃত জায়গাগুলোতে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও পানি জমে আছে, কোথাও খোলা ড্রেন দিয়ে ধীরগতিতে প্রবাহিত হচ্ছে নোংরা পানি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দিনের বেলাতেও এসব এলাকায় মশার উপদ্রব থাকে। সন্ধ্যার পর তা আরও বেড়ে যায়।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু ক্যাম্পাসের খোলা জায়গা নয়, কিছু শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, পুরোনো ভবনের আশপাশ এবং আবাসিক এলাকার পরিবেশ নিয়েও তাদের উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্লাসে বসে থাকার সময় মশার উপদ্রবের কারণে অনেক শিক্ষার্থী অস্বস্তিতে থাকেন। এতে স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তারা।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ২১৫৮ জন, মৃত্যু ৬
ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত পুরুষ, মৃত্যু বেশি নারীর
ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী নাবিল আহমেদ বলেন, সকালে ক্লাসে বসে অনেক সময় মশার কামড় খেতে হয়। বাইরে থেকে ক্যাম্পাস পরিষ্কার মনে হলেও ভেতরের কিছু জায়গায় মশার উপদ্রব অনেক বেশি। ডেঙ্গুর সময় বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় কাজ করে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনায় মহানগরী ও জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্নাতক শ্রেণির আবাসিক শিক্ষার্থী মইনুল ইসলাম বলেন, আবাসিক এলাকার কিছু জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মশার উৎপাত বেড়ে যায়। নিয়মিতভাবে এসব জায়গা পরিষ্কার করা হলে এবং ড্রেনগুলো ঠিক রাখা হলে সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রাবাস, স্টোররুম, পুরোনো ভবনের পেছনের অংশ, ক্যান্টিন, খেলার মাঠের প্রান্ত, নির্মাণাধীন এলাকা এবং পরিত্যক্ত সামগ্রী রাখার স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এসব জায়গা দীর্ঘ সময় নজরদারির বাইরে থাকলে সামান্য বৃষ্টিতেও পানি জমে থাকতে পারে। সেই পানি পরে এডিস মশার প্রজননের সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠতে পারে।
রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলেও একই ধরনের কিছু চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির আশপাশের কয়েকটি স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়, আবার কোথাও আশপাশের আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে পানি চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতের জায়গার কাছাকাছি এমন পরিবেশ থাকায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মর্নিং শিফটে সন্তানকে স্কুলে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অভিভাবক নাসিমা সুলতানা। তিনি বলেন, সকালের শিফটে বাচ্চারা ক্লাসে যাওয়ার আগে থেকেই মশার উপদ্রব নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। অনেক সময় বাচ্চাদের মশা থেকে বাঁচাতে ওডোমস ব্যবহার করে দিতে হয়। এত ছোট বয়সে প্রতিদিন এভাবে মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা করে স্কুলে পাঠানোও স্বস্তির নয়।
তিনি বলেন, শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক না করে স্কুল কর্তৃপক্ষের ক্যাম্পাসের ভেতরের পরিবেশটাও নিয়মিত নিরাপদ রাখা দরকার। কোথাও পানি জমে থাকলে দ্রুত অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো উচিত।
সকালে ক্লাসে বসে অনেক সময় মশার কামড় খেতে হয়। বাইরে থেকে ক্যাম্পাস পরিষ্কার মনে হলেও ভেতরের কিছু জায়গায় মশার উপদ্রব অনেক বেশি। ডেঙ্গুর সময় বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় কাজ করে
নাবিল আহমেদ, শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
রাজিয়া আক্তার নামের আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে যদি সারাক্ষণ ভাবতে হয় সে মশার কামড় খাচ্ছে কি না, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা হয়। বিশেষ করে সকালে ক্লাস শুরুর সময় শ্রেণিকক্ষে মশার উপস্থিতি থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে শ্রেণিকক্ষ ও আশপাশের জায়গা পরিদর্শন করা দরকার। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা আসার আগেই নির্ধারিত ও নিরাপদ পদ্ধতিতে মশক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে মশা কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেটিও শনাক্ত করা প্রয়োজন।
দুই বাড়ির ফাঁকে এডিসের বাসা: ফুলের টবেও ডেঙ্গু ঝুঁকি
ঘরে ঘরে জ্বর: সচেতনতায় পরীক্ষা, অনাগ্রহে বাড়ছে ঝুঁকি
আবার অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের আগে ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোথাও মশার উপদ্রব বা প্রজননের সম্ভাব্য উৎস পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীরা আসার আগেই তা অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে খালি শ্রেণিকক্ষে অনুমোদিত পদ্ধতি ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার কথাও বলছেন তারা।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশ ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠনের, প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনায় মহানগরী ও জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে যদি সারাক্ষণ ভাবতে হয় সে মশার কামড় খাচ্ছে কি না, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা হয়। বিশেষ করে সকালে ক্লাস শুরুর সময় শ্রেণিকক্ষে মশার উপস্থিতি থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত
রাজিয়া আক্তার, অভিভাবক
ঢাকা জেলা প্রশাসকের দেওয়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে সভাপতি করে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠন করা হবে। কমিটিতে একজন অভিভাবক প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোনীত একজন প্রতিনিধি, দুজন শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান মনোনীত একজন শিক্ষক সদস্যসচিব হিসেবে থাকবেন।
পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার ও প্রচারণা চালানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিষাক্ত কিংবা অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য পরিষ্কার করানো যাবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে বলা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি শনিবার ডেঙ্গু মশা নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। এসব কার্যক্রমের ছবি, সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করে প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত ই-মেইলে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। তারা যদি নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন হয়, তাহলে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরির সুযোগ কমে যাবে
ফরিদা খানম, জেলা প্রশাসক, ঢাকা
এর আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাজার কমিটি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
‘ক্লিন স্কুল টিম’ই হবে ডেঙ্গু প্রতিরোধের নতুন ঢাল : ডিসি ফরিদা খানম
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের অভিযান নয়, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে গড়ে তোলা ‘ক্লিন স্কুল টিম’ ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ই হবে নতুন ঢাল।
হাম-ডেঙ্গু-নিউমোনিয়া একাকার শিশু ওয়ার্ডে, সংক্রমণ ঠেকাবে কে?
ডেঙ্গু আতঙ্কে তুঙ্গে মশারির কদর: সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে জ্বলছে কয়েল
ফরিদা খানম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। তারা যদি নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন হয়, তাহলে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরির সুযোগ কমে যাবে। এ কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠন করা হয়েছে।
তিনি জানান, ‘ক্লিন স্কুল টিম’-এর উদ্দেশ্য শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা গড়ে তোলাও এর লক্ষ্য। কোথাও পানি জমে আছে কি না, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হবে।
তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজেরা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গিয়ে কাজ করবে না। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
শুধু এককালীন অভিযান নয়, নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাস, শ্রেণিকক্ষ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে
ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, ডিজি, মাউশি
তিনি বলেন, আমরা চাই এই কার্যক্রম যেন এক দিনের কর্মসূচি হয়ে না থাকে। নিয়মিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে : মাউশি ডিজি
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারির জন্য এরইমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু এককালীন অভিযান নয়, নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাস, শ্রেণিকক্ষ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাউশি মহাপরিচালক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবাইকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে হবে। সম্মিলিতভাবে সচেতনতা ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বহুতল ভবনেই বেশি লার্ভা, বলছে ডিএসসিসি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক এক জরিপেও রাজধানীতে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থলের মধ্যে বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি (৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ) লার্ভা পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে একক বাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবন।
প্রজননস্থলের ধরন বিবেচনায় মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর পরিসংখ্যান
চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৩০ জন এবং মারা গেছেন ২৩৩ জন। এর মধ্যে আগস্ট মাসে মারা গেছেন ৪৩ জন। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত ১৩৬ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। আর ২০২২ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ২৮১ জন।
আপনার মতামত লিখুন :