আইসিসি প্রেসিডেন্ট ও আইনজীবীর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 19, 2026 ইং
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং আদালটির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন।
যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তে আইসিসির ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আদালতটির মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই নতুন করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে মার্কো রুবিও অভিযোগ করেন, তোমোকো আকানে ও আবদুলায়ে সেয়ে এমন সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন, যাদের সরকার আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেয়নি। তাঁর দাবি, আইসিসি নিজস্ব ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে।
রুবিও আইসিসিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত এবং মারাত্মকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন আদালত’ হিসেবেও অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ আমরা সহ্য করব না।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে আইসিসি। আদালতটি বলেছে, তাদের বিচারক, প্রসিকিউটর ও কর্মীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আইনের শাসনকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলো যে দায়িত্ব আদালতকে দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে কাজ করা বিচারক, প্রসিকিউটর ও কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আদালতের কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের কারণে হুমকির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে বলে মনে করে আইসিসি।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে আইসিসির অন্তত ১১ জন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন বিচারক ও প্রধান প্রসিকিউটর রয়েছেন।
এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা ব্যাংকগুলোর লেনদেনেও এসব নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে পারে।
আইসিসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের অন্যতম কারণ আদালটির বিভিন্ন তদন্ত। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির তদন্ত এবং গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে আদালটির বিরোধ আরও তীব্র হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। তবে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আইসিসির পদক্ষেপকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে অভিযোগ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—দুই দেশই আইসিসির সদস্য নয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে আইসিসির সদস্য হয়। ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের এখতিয়ার আদালটির রয়েছে।
আইসিসির প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই আদালটির কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে ওয়াশিংটন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
গত মাসে মার্কো রুবিও আইসিসির সদস্য দেশগুলোকে আদালত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগকে আইসিসিকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচারবিষয়ক পরিচালক লিজ এভেনসন বলেছেন, আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহির ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রাখে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বিষয় আদালতে পাঠালেও আইসিসি সেটির তদন্ত ও বিচার করতে পারে।
ফলে আইসিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও আদালটির মধ্যকার বিরোধকেই সামনে আনেনি, বরং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সূত্র: বিবিসি
আপনার মতামত লিখুন :