হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন পাহারায় থাকা ২ ট্যাংকারে ইরানি হামলা
ওপেন নিউজ ৭১
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 1, 2026 ইং
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও থমকে যাওয়া যুদ্ধ নিয়ে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভাকে নিয়ে বৈঠকে বসেছেন, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালিতে নতুন সামরিক আঘাত হানল ইরান। মার্কিন বাহিনীর পাহারায় থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে তেহরান।
শুক্রবার ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ‘নীতি অমান্যকারী’ ওই তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে আঘাত করা হয়েছে এবং সেগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর মার্কিন পাহারায় থাকা আরো চারটি তেলবাহী ট্যাংকার দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করে পূর্বের স্থানে ফিরে যায়। জাহাজগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর পাহারায় একটি ‘অঘোষিত রুট’ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল বলে দাবি করা হয়।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত দুটি ভিন্ন রুট ব্যবহার করে জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হচ্ছে। এর মধ্যে ওমান উপকূলের কাছে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় পথটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে বোমাবর্ষণ করছে ইরান। অন্যদিকে, ইরানের জাহাজ ও সমুদ্রবন্দরে নিজেদের আরোপিত অবরোধ লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে হু-হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম। জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায় ওয়াশিংটন। এরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
শুক্রবারও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে লড়াই অব্যাহত ছিল। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ইরানি ড্রোন তারা সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
একই সময়ে লেবাননে প্রাচীন বিউফোর্ট দুর্গের কাছে রাতভর বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। তেল আবিবের দাবি, হিজবুল্লাহর টানেল ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে তারা এই হামলা চালিয়েছে। বিকট বিস্ফোরণের শব্দে দক্ষিণ লেবানন কেঁপে ওঠে এবং আশপাশের এলাকা ছাই ও ধুলায় ঢেকে যায়।
এই হামলার মাধ্যমে ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন লেবাননের কর্মকর্তারা। তবে ইসরায়েলের দাবি, তারা নিজেদের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্প শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি চালু করার চেষ্টা করলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো হামলা সামান্যই ফলপ্রসূ হয়েছে। ফলে দেশটিতে দেখা দেওয়া জ্বালানিসংকটের কারণে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া রয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাকে ব্যালট বাক্সে জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের লক্ষ্যে শুক্রবার মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিড অবকাশযাপন কেন্দ্রে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বৈঠক ডাকেন ট্রাম্প। যদিও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত সপ্তাহে এক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, এই বৈঠকটি হবে ‘অনেক মজার এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য একটি ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা।’
তবে বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল ইরান যুদ্ধ। ট্রাম্প যুদ্ধটি মাত্র কয়েক সপ্তাহে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও দেখতে দেখতে তা পাঁচ মাসে গড়িয়েছে।
রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন আমেরিকানের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন।
মার্কিন কংগ্রেসেও এই সংঘাতের প্রতি সমর্থন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে আনা একটি প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে সামান্য ব্যবধানে হেরে গেছে—যেখানে পক্ষে ৪৯ এবং বিপক্ষে ৫০টি ভোট পড়ে।
যুদ্ধের প্রভাবজনিত মূল্যস্ফীতি মার্কিন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনীতির মাঠে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তারা আশা করছে, এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও অস্থিরতার সুযোগে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা লুটছে জ্বালানি কোম্পানিগুলো। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিখ্যাত মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এক্সনমবিলের মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে এবং শেভরন জানিয়েছে, তাদের মুনাফা বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আপনার মতামত লিখুন :