
স্বর্ণ ব্যবসার অনুমতি থাকলেই একজন ব্যবসায়ী ও ডিলার বিদেশ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত স্বর্ণ আনতে পারবেন। এই পরিমাণ স্বর্ণ আমদানিতে পূর্বানুমোদন ও অনাপত্তিপত্রসহ (এনওসি) কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার এনওসি লাগবে না। বৈধ কাগজপত্র থাকলেই হবে।
স্বর্ণ আমদানি উৎসাহিত করতে সরকার এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এসব পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যমান নীতিমালায় সংশোধন এনে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০২৬’ নামে প্রকাশ করা হবে। এর আগে ২০১৮ সালে প্রথম স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই নীতিমালা পরে ২০২১ সালে সংশোধন করে বর্তমানে মেনে চলা হয়।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খান বলেন, এখন একজন ব্যবসায়ী বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করতে হলে পূর্বানুমোদন, অনাপত্তিপত্রসহ (এনওসি) বেশ কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। জটিল ও সময় সাপেক্ষ এ প্রক্রিয়ার কারণে বাংলাদেশে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি হয় না বললেই চলে। আশা করি, নতুন নিয়মে স্বর্ণ আমদানি হবে।
এনামুল হক খান আরও বলেন, নতুন নীতিমালায় স্বর্ণ আমদানি সহজ করা হলে সমগ্র স্বর্ণ ব্যবসায়ে ইতিবাচক ধারা আসবে। মূলত স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা বিভিন্ন রকম প্রভাব খাটিয়ে স্বর্ণ আমদানিতে জটিলতা তৈরি করে রেখেছে। বৈধভাবে আমদানির সুযোগ হলে আমরা দ্রুত রপ্তানিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারব। এটি চূড়ান্ত সম্ভাবনাময় বাজার।
স্বর্ণ আমদানি সহজ করে এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন স্বর্ণ নীতিমালার সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এ খসড়া নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয়ে বৈঠক করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নতুন নীতিমালায় অনানুষ্ঠানিক আমদানি ‘নিরুৎসাহিত’ করতে কঠোর পদক্ষেপ থাকবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘ব্যবসায়ীরা হ্যান্ড ক্যারিং (বিদেশ থেকে নিজে আনা) ছাড়াও আগের মতো প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেও স্বর্ণ আনতে পারবেন। দশ কেজি পর্যন্ত হ্যান্ড ক্যারিংয়ে ব্যবসায়ী ইনভয়েস, পাসপোর্টের তথ্য, উৎস সনদ, বিশুদ্ধতার সনদ, ব্যাংকিং নথি ও পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য বিমানে ওঠার আগেই ব্যাগেজ ঘোষণা ফরমে উল্লেখ করবেন। এ সেবা সহজ করতে ‘ওয়ান স্টপ সলিউশন’ নামের একটি অনলাইন পোর্টাল করবে সরকার। যাতে কাস্টমস দ্রুত তা খালাসে উদ্যোগ নিতে পারে।’
খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ‘যেসব ডিলার ব্যবসায়ী ১০ কেজির বেশি স্বর্ণ আমদানি করবেন, তাদের আলাদা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এনওসি নিতে হবে। এনওসি দেওয়ার সময় ১০ কার্যদিবস থেকে কমিয়ে দুই কার্যদিবস করার প্রস্তাব করা হয়েছে।’
খসড়া নীতিমালায় কঠোর করা হচ্ছে ব্যাগেজ রুলস। ব্যাগেজ রুলসের আওতায় সাধারণ যাত্রীরা কতটুকু স্বর্ণ আনতে পারবে, তা বাজুসের পরামর্শে নির্ধারণ করা হবে। সংগঠনটি এ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেবে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির নেতারা বলেন, ব্যবসায়ীদের বিদেশ থেকে স্বর্ণ আনার সুযোগ ছিল, তবে প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত জটিল। এ প্রক্রিয়া সহজ করতে আমরা সরকারকে বলেছি। সরকার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
তারা আরও বলেন, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে এতদিন স্বর্ণ আমদানি হয়নি। অনুমোদিত ডিলাররা জটিলতার কারণে আনতে চাইলেও সেটি আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ভরিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ বেশি হয়। তাই স্বর্ণ আমদানিতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছিল না।
খসড়া নীতিমালায়, ‘খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হলে নতুন করে অনুমোদিত ডিলার নিয়োগ দেবে সরকার। প্রকৃত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছাড়া কেউই ডিলার লাইসেন্স পাবেন না। স্বর্ণর অনুমোদিত ডিলার আমদানিকারকদের বর্তমানে লাইসেন্স নিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। তবে প্রস্তাবনায় এই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে।’
নতুন নীতিমালায় স্বর্ণর ব্যবসায় শক্তিশালী ভূমিকা থাকছে বাজুসের হাতে। সংশোধিত প্রস্তাবে বাজুসকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতোই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ধারায়। ডিলার আমদানিকারকের নিবন্ধন পেতে হলে অবশ্যই তাকে বাজুসের সদস্য হতে হবে এবং সদস্যপদ বহাল থাকতে হবে।
তবে খসড়া নীতিমালায় চোরাচালান রোধে কঠোরতা নেই। তবে বিক্রিতে কড়াকড়ি করা হচ্ছে। ব্যক্তি গ্রাহক যখন স্বর্ণ বিক্রি করবেন তখন তাকে পুরোনো সময়ে (আগে যখন কিনেছেন) স্বর্ণ কেনার রসিদ দেখাতে হবে। খসড়ায় ওই স্বর্ণর উৎস বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গণমাধ্যমকে বলেন, চোরাচালানকৃত স্বর্ণ যেন অর্থনীতিতে প্রবেশ ও ব্যবহার না হতে পারে–তা নিশ্চিত করতে পুরোনো স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী মূসক চালান বা অর্থ গ্রহণের রসিদ দাখিল করতে হবে।
নতুন নীতিমালায় স্বর্ণর ব্যবসায় শক্তিশালী ভূমিকা থাকছে বাজুসের হাতে। সংশোধিত প্রস্তাবে বাজুসকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতোই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ধারায়। ডিলার আমদানিকারকের নিবন্ধন পেতে হলে অবশ্যই তাকে বাজুসের সদস্য হতে হবে এবং সদস্যপদ বহাল থাকতে হবে। বাজুসের সদস্য ছাড়া কেউ এখন আর স্বর্ণর ব্যবসা করতে পারবেন না।
স্বর্ণর দাম লাগাম ছাড়া। গতকাল দেশের বাজারে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণর গহনা ভ্যাটসহ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকার ওপরে। আর কম দামি বা সনাতন পদ্ধতির এক ভরি স্বর্ণর গহনা বিক্রি হচ্ছে দেড় লাখ টাকার বেশি দামে। ভালো মানের রুপার গহনার ভরি বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার টাকার ওপরে।
গত মঙ্গলবার ১১ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে স্বর্ণর গহনা ও রুপার গহনার নতুন দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন দাম নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এই দামেই দেশে স্বর্ণর গহনা ও রুপার গহনা বিক্রি হবে।
বাজুস নির্ধারণ করা দর অনুযায়ী বর্তমানে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণর গহনা ভ্যাটসহ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণর গহনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৯০ টাকা। এ ছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণর গহনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৪ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫২২ টাকা।