
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশটির সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। এগুলো হলো—রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) সদস্যপদ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ সরকারের ও বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
আরসিইপি সদস্যপদে সমর্থন
বৈঠকে বাংলাদেশের আরসিইপি সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ জানায়, সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরসিইপির বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এসব সংস্কারের মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষা বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের বিষয় রয়েছে।
আরসিইপির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন চাওয়া হয়। একই সঙ্গে সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের জন্য ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় চায় বাংলাদেশ
বৈঠকে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে যে আবেদন করেছে, সেটির পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ জানায়, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত প্রস্তুতির কাজে ব্যবহার করে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায় সরকার।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএ চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনের প্রাক্কালে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের আলোচনার ধারাবাহিকতায় এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পণ্য ও সেবার জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার তৈরি হতে পারে।
তিনটি প্রস্তাব বাংলাদেশের
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়।
প্রথমত, আরসিইপি ও এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, এফটিএ আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও বাড়বে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতি, বাজার সম্প্রসারণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল নিউজিল্যান্ডের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তারা এতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।