
আফ্রিকার নারী ফুটবলে যেন পালাবদলের হাওয়া। একদিকে মহাদেশের সবচেয়ে সফল দল নাইজেরিয়া বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। আর অন্যদিকে সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপের টিকিট কেটে ফেলেছে মালাউই।
নারী আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (ডব্লিউআফকন) কোয়ার্টার-ফাইনালে ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে ‘দ্য স্কর্চার্স’ খ্যাত মালাউই। এই জয়ে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপে আফ্রিকার সরাসরি চার টিকিটের শেষটি নিশ্চিত করেছে তারা।
ম্যাচে আগে গোল করে ঘানাকে চাপে ফেলে মালাউই। এরপর কানসাস সিটি কারেন্টের তারকা টেমওয়া চাওয়িঙ্গা করেন টুর্নামেন্টে নিজের চতুর্থ গোল। শেষ পর্যন্ত রোজ কাডজেরের জয়সূচক গোলেই নিশ্চিত হয় মালাউইর অবিশ্বাস্য জয়।
বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার দৌড়ে মালাউইর এই সাফল্য আরও বিস্ময়কর তাদের র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫৩ নম্বরে থাকা দলটি হারিয়েছে ৬০ নম্বরে থাকা ঘানাকে। এর আগে গ্রুপ পর্বে টুর্নামেন্টের রেকর্ড ১০ বারের চ্যাম্পিয়ন নাইজেরিয়াকেও হারিয়েছিল মালাউই।
পরের ম্যাচে র্যাঙ্কিংয়ে ৫৪ ধাপ এগিয়ে থাকা মিশরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করে ফেলে দলটি।
২০০২ সালের আগে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি মালাউই। এই ডব্লিউআফকন-ই মূলত তাদের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। সেই আসরেই তারা লিখে ফেলল দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়- প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা।
একদিকে মালাউই যখন ইতিহাস লিখছে, তখন দুঃস্বপ্নের রাত কাটিয়েছে নাইজেরিয়া। কোয়ার্টার-ফাইনালে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে প্রথমবার সেমি-ফাইনালের আগেই বিদায় নিল ‘সুপার ফ্যালকনস’।
ক্যাসাব্লাঙ্কায় ম্যাচের প্রথমার্ধেই মায়েভা নিয়াদজুর গোলে এগিয়ে যায় ক্যামেরুন। এরপর সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে নাইজেরিয়া। কিন্তু ক্যামেরুনের গোলরক্ষক মাইকেলি বিহিনা ছিলেন অদম্য। একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে মোট নয়টি সেভ করেন তিনি।
নাইজেরিয়ার জন্য এই হার শুধু একটি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বকাপের টিকিটেও।
১৯৯১ সালে প্রথম নারী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি আসরে খেলেছে নাইজেরিয়া। আফ্রিকা থেকে একমাত্র দল হিসেবে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে তারা। কিন্তু এবার সেই রেকর্ডই ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায়।
বিশ্বকাপে যেতে হলে এখন প্লে-ইন ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে হবে নাইজেরিয়াকে। আগামী ১৩ আগস্টের সেই ম্যাচে জিতলে আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফে যাওয়ার সুযোগ মিলবে।
সেখানে ছয় দলের গ্রুপে সেরা দুইয়ে থাকতে হবে। এরপর এক ম্যাচের শেষ ধাপ পেরোতে পারলেই মিলবে ২০২৭ বিশ্বকাপের টিকিট।
অন্য প্লে-ইন ম্যাচে মুখোমুখি হবে ঘানা ও আইভরি কোস্ট।
কোয়ার্টার-ফাইনালের পর ডব্লিউআফকনের সেমি-ফাইনালেও থাকছে নতুনত্ব। এক ম্যাচে মুখোমুখি হবে ইতিহাস গড়া মালাউই ও আলজেরিয়া। অন্য সেমি-ফাইনালে খেলবে স্বাগতিক মরক্কো ও ক্যামেরুন।
আলজেরিয়াও এরই মধ্যে প্রথমবারের মতো নারী বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। ফলে আফ্রিকার নারী ফুটবলে এবার দেখা যাচ্ছে নতুন দুই শক্তির উত্থান।
বিশ্বকাপের বাকি জায়গাগুলোও ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের সরাসরি জায়গাগুলো নিশ্চিত হয়েছে। কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাই শুরু হবে নভেম্বরে, আর ইউরোপের বাছাই ফের শুরু হওয়ার কথা অক্টোবরে।
ইউরোপের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনার প্রতিবাদে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্ভাব্য বয়কট নিয়ে আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপের ছবি যত স্পষ্ট হচ্ছে, আফ্রিকার ফুটবলে ততই যেন বদলে যাচ্ছে পুরোনো হিসাব। আর সেই বদলের সবচেয়ে উজ্জ্বল গল্প এখন- মালাউই।