
দুর্দান্ত স্পেনের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন বেলজিয়াম গোলকিপার থিবো কর্তোয়া। লামিন ইয়ামাল, ফেরান তোরেসদের একের পর এক আক্রমণ রুখে দেওয়ার পরও স্পেন এগিয়ে যায়। বেলজিয়াম অবশ্য সমতায় ফিরতে দেরি করেনি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কর্তোয়াকে ব্যথা নিয়ে মাছ ছাড়তে হয়, এরপর বেঞ্চে বসেই দেখেছেন দলের হার। শেষ মুহূর্তের গোলে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে উঠেছে লা রোজারা।
শুক্রবার রাতে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারায় স্পেন। ৩০ মিনিটে স্পেনকে এগিয়ে দেন ফাবিয়ান রুইজ। ১১ মিনিট পর বেলজিয়ামকে সমতায় ফেরান চার্লস ডে কেতেলায়েরে। আর শেষ দিকে মিকেল মেরিনোর গোলে জেতে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
সেমি-ফাইনালে আগামী ১৪ জুলাই রাতে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে স্পেন।
স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যে এটি ছিল বিশ্বকাপে তৃতীয় সাক্ষাৎ এবং কোয়ার্টার-ফাইনালে দ্বিতীয়। এর আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর পেনাল্টিতে রেড ডেভিলরা পরের রাউন্ডে যায়। এরপরের একমাত্র সাক্ষাতে ১৯৯০ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেন ২-১ গোলে জেতে। আজ আরও একবার বেলজিয়ামকে কাঁদিয়ে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করল স্প্যানিয়ার্ডরা।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেন ১২টি সাক্ষাতে অপরাজিত থাকলো। এবং ইউরো ১৯৮০-তে ২-১ গোলে হারের পর থেকে এ নিয়ে ১০বার জিতেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে এদিন শুরু থেকে স্পেন প্রতিপক্ষের রক্ষণে বেশিরভাগ সময় হানা দেয়। বেশ কিছু হাফ চান্সও আসে এসময়। কিন্তু বেলজিয়ামের বক্সে গিয়ে কিংবা বক্সের সামনে তাদের বেশিরভাগ আক্রমণ মুখ থুবড়ে পড়ে। ২১ মিনিটে বক্সের একটু সামনে থেকে নেওয়া ইয়ামালের কোনাকুনি শট বেরিয়ে যায় পোস্টঘেঁষে।
প্রথমার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে স্পেন। ৩০ মিনিটে দারুণ এবং গোছানো আক্রমণ থেকে এগিয়েও যায় লা রোজারা। ডান দিকে ইয়ামালের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে পোরো বল দেন ওলমোকে, স্পেন মিডফিল্ডারের নেওয়া নিচু শট প্রথমে ঠেকিয়ে দেন থিবো কর্তোয়া। হতে পারত এটি দুর্দান্ত সেভ, কিন্তু পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে না পারায় ফিরতি শটে খুব কাছ থেকে জালে বল জড়ান রুইজ।
স্পেন এগিয়ে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পর ফ্রি কিকে ইয়ামালের বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে বলটি বেলজিয়ামের রক্ষণ প্রাচীরের ভেতর দিয়ে জালে জড়াবে মনে হচ্ছিল, তবে কর্তোয়া দুই হাতে দ্রুত ক্লিয়ার করেন।
ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখে স্পেন। খানিক পর ইয়ামালের দারুণ শট কাঁপায় পাশের জাল। কিন্তু ৪১ মিনিটে প্রতি আক্রমণে উঠে কেভিন ডি ব্রুইনের ক্রসে গোলমুখের সামনে হেডে লক্ষ্যভেদ করেন চার্লস ডে কেতেলায়েরে। স্পেন গোলকিপারের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। ওই গোলে ১-১ সমতা নিয়ে বিরতি যায় দুই দল।
৫৫ মিনিটে ডি ব্রুইনের পাস পোস্টের কোনায় পেয়েছিলেন ডোকু, তবে এই উইঙ্গার ব্যাকপাস দেন ম্যাক্সিম ডি কুপারকে। বেলজিয়াম ডিফেন্ডার দারুণ শট নিলেও সেটি লাগে সাইড নেটে। তিন মিনিট পর দূর থেকে লামিন ইয়ামালের শট ডান দিকে ঝাপিয়ে রুখে দেন কর্তোয়া।
ম্যাচে দুর্দান্ত খেলেও এরপর লিড নিতে পারছিল না স্পেন। কর্তোয়ার একের পর এক সেভে ম্যাচে থাকে বেলজিয়াম। ৬১ মিনিটে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শট নেন, কিন্তু কর্তোয়া আরও একবার বাঁচিয়ে দেন দলকে। দুর্দান্ত খেলা ইয়ামালের গোলবঞ্চিতই থাকেন। পরের মিনিটে বেলজিয়াম অধিনায়কের শট আটকে দেন স্পেন গোলকিপার উনাই সিমন।
এই সময় দুই পোস্টের নিচে গোলকিপারদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। খানিক পর বেলজিয়ামকে আরও একবার বাঁচিয়ে দেন কর্তোয়া। ইয়ামাল প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারের চ্যালেঞ্জ উতরে বল দেন ওয়ারজাবালকে, গোলের সামনে থেকে স্প্যানিশ স্ট্রাইকারের কাছের পোস্টে নেওয়া শট কর্তোয়া রুখে দেন।
৭১ মিনিটে আবেগঘন মুহূর্ত সামনে আসে, ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়েন কর্তোয়া,তাঁর বদলি হিসেবে মাঠে নামেন সেনে ল্যামেন্স। চোখ ভেজা অবস্থায় মাঠ ছাড়েন কর্তোয়া।
পরের ১৫ মিনিট চেষ্টা চালিয়েও বেলজিয়ামের রক্ষণ দেওয়াল টপকাতে পারছিল না স্পেন। অবশেষে ৮৮ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় স্পেন। কুবার্সির দুরপাল্লার শট আটকে দেন বদলি গোলকিপার, কিন্তু পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে না পারায় বল ছিল তাঁর সামনেই, দৌরে এসে মিকেল মেরিনো ল্যামেন্সের মাথার উপর দিয়ে গোল করেন। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন। এই গোলের মাত্র ৪ মিনিট আগেই দানি ওলমোর বদলি হিসেবে নামে মেরিনো। আর শেষ পর্যন্ত জয়ের নায়কও হয়ে যান স্পেনের সেন্টার মিডফিল্ডার।
মাঠে নামার মাত্র ১১৫ সেকেন্ডের মধ্যে করা এই গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্পেনের কোনো বদলি ফুটবলারের দ্রুততম গোল। এর আগে ১৯৮২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে এনরিকে সাউরার ১৫৯ সেকেন্ডের রেকর্ডটি ছিল সর্বোচ্চ। শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিপক্ষেও ঠিক একইভাবে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোলটি করেন মেরিনো। টানা দুই ম্যাচে ৮০ মিনিটের পর বিশ্বকাপে জয়সূচক গোল করা প্রথম ফুটবলারও তিনি।
পিছিয়ে পড়ার পর শেষ সময়ের মরণকামড় দিতে চেষ্টা চালায় বেলজিয়াম। কিন্তু ম্যাচের ফেরার গোলের দেখা মিলছিল না। তবে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে গোলের খুব কাছাকাছি গিয়ে ফিরতে হয় বেলজিয়ামকে। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা।