
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে সাত বছরের শিশু নন্দিনী কান্ত রায় হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন তাণ্ডব ও রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান এবং আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ প্রশাসনের ৭টি গাড়ি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হককে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে।
এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায় (২২) ও তার বাবা রণজিৎ কুমারকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত নন্দিনী ওই গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে।
আজ মঙ্গলবার সকালে উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নন্দিনী রানী ওই গ্রামের কৃষক নলনী বর্মণের মেয়ে এবং স্থানীয় ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মঙ্গলবার সকালে ভুট্টাক্ষেতে মাটিচাপা দেয়া ও বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহের সন্ধান মেলে।
পরে সেখানে মাটি খুঁড়ে নন্দিনীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বিধান চন্দ্র নামে এক যুবককে ওই ভুট্টাখেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। এই সন্দেহের সূত্র ধরে বিক্ষুব্ধ জনতা বিধানের বাড়িতে চড়াও হয়। গ্রেফতার এড়াতে বিধান নিজের বাড়ির বাইরে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে আদিতমারী থানা পুলিশ শিশুটির চাচা (পারিবারিক সম্পর্কের) বিধানকে (১৯) প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করে। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকেই তাকে আটক করে পুলিশ। তবে আটকের পর আসামিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের পথরোধ করে এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক বিধানের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং ইউএনওসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। প্রশাসন স্থানীয়দের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু আসামিকে নিয়ে ফিরে আসার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুনরায় উত্তেজিত হয়ে প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে ডিসি, এসপি এবং ইউএনওর ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হন।
একে একে সেখানে উপস্থিত হয় সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির সদস্যরা। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ পুরো প্রশাসন ও ক্রাইমসিন ইউনিটকে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। থেমে থেমেই চলতে থাকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলা।
অবশেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তাদের উদ্ধারসহ অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। চলে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল ও লাঠি সোটা নিয়ে হামলা চালানো হয়।
জনতার ছোড়া ইটের আঘাতে এসপি আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসিসহ ৩০ জন আহত হন এবং ডিসির গাড়িসহ ৭টি গাড়ি দুমড়েমুচড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ভুট্টাখেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দি করে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ভুট্টাক্ষেতে শিশুটির লাশ পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সেখানে যায়। কিন্তু আসামিকে নিয়ে আসার সময় জনগণ বাধা প্রদান করে। পরে বিজিবি ও বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে আমরা সেখানে যাই। সবাইকে বুঝিয়ে আসামিকে নিয়ে আসার সময় অতর্কিতভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এতে আমাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর হয় এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আসামিকে নিয়ে আসার সময় পুলিশের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়েছে। বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং আমাদের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেয়ার অপরাধে এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হবে।